জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে সাহাবী ও তাবেয়ীদের উক্তি ━━━━━━ • ✿ • ━━━━━━

আলী (রা) কোমাইল নামক এক ব্যক্তিকে বললেন, "হে কোমাইল! জ্ঞান ধনসম্পদ অপেক্ষা উত্তম। জ্ঞান তোমাকে নিরাপত্তা দেয়, হেফাজত করে, আর তুমি ধনসম্পদের নিরাপত্তা দাও। জ্ঞান শাসক আর ধনসম্পদ শাসিত। সম্পদ ব্যয় করলে হ্রাস পায় আর জ্ঞান ব্যয় করলে বৃদ্ধি পায়। (তারীখে বাগদাদ: ৬: ৩৭৬)

তিনি আরও বলেন, 'আলেম ব্যক্তি রোযাদার, ইবাদতকারী ও জিহাদকারী অপেক্ষা উত্তম। আলেম ব্যক্তির মৃত্যু হলে ইসলামে এমন শূন্যতা দেখা দেয়, যা তার উত্তরসূরি ছাড়া কেউ পূরণ করতে পারে না।' (কুতুল কুলুব: ১: ১৪৩)

আলী (রা) থেকে বর্ণিত একটি কবিতা, তিনি বলেন-

আলেমদের গৌরব হলো, সে নিজে যেমন পথপ্রাপ্ত, তেমিন অপরেরও পথপ্রদর্শক। সৌন্দর্যের বস্তু কারও অর্জিত রয়েছে, এটিই মানুষের মর্যাদা। মূর্খরা সদা জ্ঞানীদের সাথে শত্রুতা পোষণ করে। তথাপি তুমি এমন জ্ঞান অর্জন করো, যদ্দ্বারা চিরজীবী হতে পারো। সকল মানুষ মৃত; কিন্তু জ্ঞানী অমর। (দেওয়ানে আলী: ৩০)

আবুল আসওয়াদ (র) বলেন, ইলমের চেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আর কোনো বিষয় নেই। বাদশাহ জনগণের শাসক হয়ে থাকেন। কিন্তু জ্ঞানীরা হন বাদশাহদের শাসক। (উয়ুনুল আখবার: ২: ১২১)

ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, হযরত সুলায়মান (আ)-কে ইলম, ধনসম্পদ ও রাজত্বের মধ্য থেকে যে-কোনো একটি বেছে নেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছিল। তিনি ইলমকে বেছে নিলেন। ফলে তাঁকে ইলমের সঙ্গে ধনসম্পদ এবং রাজত্বও দান করা হয়। (তারিখে দিমাশক: ২২: ২৭৫)

আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (র)-কে কেউ প্রশ্ন করল, মানুষ কারা? তিনি বললেন, জ্ঞানীরা। এরপর জিজ্ঞেস করা হলো, বাদশাহ কারা? তিনি বললেন, অনাসক্ত দরবেশগণ। প্রশ্ন করা হলো, নীচ কারা? জবাব দিলেন, যারা নিজেদের দীন বিক্রি করে খায়। (হিলয়াতুল আউলিয়া: ৮: ১৬৭)

একমাত্র আলেম বা জ্ঞানী ব্যক্তিকেই শ্রেষ্ঠ মানুষ বলে গণ্য করা হয়। কেননা মানুষ এবং অন্যসব প্রাণির মাঝে যে বৈশিষ্ট্য স্বাতন্ত্র্য এনে দিয়েছে, তা হলো ইলম বা জ্ঞান। আর মানুষ তখনই মানুষ বলে গণ্য হবে যখন তার মধ্যে গৌরব ও শ্রেষ্ঠত্বের কারণ বিদ্যমান থাকবে। মানুষের মর্যাদা শক্তি বলে অর্জিত হয় না। কারণ, উট মানুষের চেয়েও অধিক শক্তিশালী এবং মোটা স্বাস্থ্য হওয়ার কারণে হয় না। কেননা, হাতির দেহ তার চেয়েও বিশালকায়। আবার বীরত্বের কারণেও নয়। কেননা, হিংস্র প্রাণির বীরত্ব মানুষের চেয়ে বহুগুণে বেশি। অতি ভোজনের কারণেও নয়। কারণ ষাড়ের উদর মানুষের চেয়েও বিশালকায়। অধিক সহবাসের কারণেও নয়। কেননা দুর্বল চড়ুইটিও এ কাজে মানুষের চেয়ে বেশি সবল। একমাত্র জ্ঞানের দিক দিয়েই মানুষ শ্রেষ্ঠ, মানুষের সৃষ্টিই জ্ঞানের জন্য। (ইতহাফুস সাদাতিল মুত্তাকিন: ১: ৯৮)

এক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেন, কেউ আমাকে বলুক, যে ব্যক্তি ইলম পায়নি, সে কী পেয়েছে এবং যে ব্যক্তি ইলম পেয়েছে, তার পাওয়ার আর কী আছে? (মিফতাহু সাআদাতিত দারাইন: ১: ১৭৫)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ أُوتِيَ الْقُرْآنَ فَرَأَى أَنَّ أَحَدًا أُوتِيَ خَيْرًا مِّنْهُ فَقَدْ حَقَّرَ مَا عَظَمَ اللَّهُ تَعَالَى.

কোনো ব্যক্তিকে কুরআনের ইলম দান করার পর সে যদি অন্যকে তারচেয়ে উত্তম মনে করে তাহলে সে আল্লাহ তাআলা যে ইলমকে মহান করেছেন তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করল। (শুআবুল ঈমান, বায়হাকী ২৩৫২)

ফাতাহ আল মুসেলী (র) বলেন, অসুস্থ ব্যক্তিকে প্রতিদিন খাদ্য, পানীয় ও ওষুধপত্র কিছুই না দিলে সে কি মরে যাবে না? উপস্থিত লোকেরা বলল, হাঁ, মরে যাবে। তিনি বললেন, আত্মার অবস্থাও তাই। আত্মাকে তিন দিন ইলম ও জ্ঞান থেকে উপবাস রাখলে সে মরে যাবে। (মিফতাহ্র দারিস সাআদাহ : ১: ১৭৫)

যথার্থ তাঁর এ উক্তি। কেননা, ইলম ও প্রজ্ঞা হচ্ছে আত্মার খোরাক; এগুলোর মাধ্যমেই তার জীবন টিকে থাকে; দেহের খোরাক যেমন খাদ্য।

যার জ্ঞান নেই, তার অন্তর অসুস্থ, তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু অনেকেই তার আত্মার রোগ ও মৃত্যুর খবর রাখে না। দুনিয়ার মহব্বতের কারণে তার চেতনা বিলুপ্ত হয়ে যায়। যেমন ভয় ও নেশার কারণে জখমের ব্যথা অনুভূত হয় না; যদিও তার ব্যথা থাকে। আর মৃত্যু যখন দুনিয়ার সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়, তখন সে আত্মার মৃত্যুর বিষয় জানতে পারে এবং খুবই অনুশোচনা করতে থাকে। তখন তার সেই অনুশোচনায় কোনো লাভ হয় না। ভীত ব্যক্তির ভয় বা মাতালের নেশা দূর হয়ে গেলে ভীত ও মাতাল অবস্থার আঘাতের যন্ত্রণা সে হাড়েহাড়ে টের পায়। সত্য উদঘাটিত হওয়ার সেই দিনের ভয়াবহ অবস্থা থেকে আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। কেননা, মানুষ এখন ঘুমিয়ে আছে। মৃত্যুর পর জাগ্রত হবে।

হাসান বসরী (র) বলেছেন, 'জ্ঞানীর লেখার কালি ও শহিদের রক্ত ওজন করলে জ্ঞানীর কালির ওজন শহিদের রক্তের চেয়ে বেশি হবে।' (তারিখে ইস্পাহান: ২:১৭৮; জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাযলিহি: ১৫৩)

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেন, 'হে লোকসকল! জ্ঞান তুলে নেওয়ার পূর্বে জ্ঞান অর্জন করো। এর অর্থ জ্ঞানী লোকেরা মৃত্যুবরণ করার পূর্বে জ্ঞান অর্জন করো। আল্লাহর শপথ! যার কব্জায় আমার প্রাণ- আল্লাহর পথে যারা শহিদ হয়েছেন, তাঁরা আলেমদের মর্যাদা দেখে আপসোস করে বলবেন, আল্লাহ তাআলা আমাদের জ্ঞানী অবস্থায় পুনরুত্থিত করলেই ভালো হতো। জ্ঞানী হয়ে কেউ জন্মগ্রহণ করে না, বরং অনুশীলনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করতে হয়'। (আয যুহদ: ৮৯৯)

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, রাতের কিছু অংশে ইলমের চর্চা করা আমার মতে সারারাত জাগ্রত থেকে নফল ইবাদত করার চেয়েও উত্তম। (মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক; ১১:২৫৩)

এ বিষয়টিই হযরত আবু হুরায়রা (রা) ও ইমাম আহমাদ (র) থেকে বর্ণিত আছে।