ঈমানের অগ্নি পরীক্ষা ━━━━━ • ✿ • ━━━━━

হযরত উমর (রা.) এর শাসন কাল। চতুর্দিকে মুসলমানদের জয়জয়কার। একের পর এক পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলমানগণ বিজয় পতাকা উড্ডীন করে চলেছেন। তাদের বিজয়ের পথে বাধা দেওয়ার সাধ্য যেন কারো নেই।

তৎকালীন সময়ে রোম আর পারস্য ছিল দুটি শক্তিধর রাষ্ট। তারা শক্তির বড়াই করতো। হযরত উমর (রা.) রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সৈন্য পাঠালেন। মুসলিম মুজাহিদরা অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বর্তমান ইতালির রাজধানী রোমের দিকে এগিয়ে চললেন।

এদিকে রোম সম্রাট মুসলমানদের অনেক কিংবদন্তীর কথা শুনেছেন। শুনেছেন তাদের অনেক বীরত্বপূর্ণ অবিশ্বাস্য কাহিনী। তিনি এও শুনেছেন যে, মুসলমানদের অপ্রতিরোধ্য বিজয় যাত্রার কারণ হলো তারা মৃত্যুকে পরওয়া করে না এবং ভয়-ভীতি বা প্রলোভনের সামনে কখনোই মাথানত করে না। এসব কথা রোম সম্রাটের বিশ্বাস হতো না। সে এগুলোকে কল্প-কাহিনী মনে করতো।

মুসলমান মুজাহিদরা রোম আক্রমণ করতে আসছে এ সংবাদপ্রাপ্ত হয়ে সম্রাটের মনে কৌতূহল জাগলো যে, যদি এ যুদ্ধে কয়েকজন মুসলমানকে জীবিত বন্দী করতে পারি তাহলে আমি পরীক্ষা করে দেখবো যে, তারা কি পরিমাণ প্রলোভনকে প্রত্যাখান করতে পারে, আর কি পরিমাণ ভয়-ভীতি উপেক্ষা করতে পারে। তাই সে তার সেনাবাহিনীকে বলে দিল, যদি তোমরা রণাঙ্গণ থেকে মুসলমানদেরকে জীবিত বন্দী করে আনতে পার তাহলে তাদের মারধর না করে যত্ন সহকারে আমার নিকট পাঠিয়ে দিবে।

৫০/৬০ জন মুসলিম মুজাহিদের দলনেতা ছিলেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে হুযাইফা (রা.)। রোমানদের সাথে মুসলমানদের তুমুল লড়াই শুরু হলে এক পর্যায়ে তিনি সঙ্গী সাথীসহ রোমানদের হাতে বন্দী হন। তাদের এ বন্দী হওয়ার পিছনে হয়তো একটি কারণ এও থাকতে পারে যে, আল্লাহ তায়ালা সকল বেঈমান-কাফের গোষ্ঠীকে বাস্তবেও দেখিয়ে দিতে চান যে, সত্যিকার অর্থেই মুসলমানগণ মৃত্যুকে ভয় করে না; টাকা-পয়সা আর ধন-ঐশ্চর্য্যের প্রলোভন দেখিয়ে কখনোই তাদেরকে সত্যের পথ থেকে সামান্যতমও বিচ্যুত করা যায় না।

যা হোক, সম্রাটের নির্দেশ মোতাবেক বন্দীদের রাজধানীতে পাঠিয়ে দেয়া হলো। সম্রাট প্রথমে আব্দুল্লাহ ইবনে হুযাইফা (রা.) কে তার খাস কামরায় ডেকে বললো, দেখ, আমি খৃষ্টান। আমি খৃষ্ট ধর্মকে ভালবাসি। যদি তুমি তোমার ধর্ম ছেড়ে আমার ধর্ম গ্রহণ কর তাহলে এখনই তোমার নামে আমার বিশাল সাম্রাজ্যের অর্ধেক লিখে দিব। শুধু তাই নয়, আমার একটি সুন্দরী ষোড়শী কন্যা আছে। তাকেও তোমার নিকট বিবাহ দেব। আমি মরে গেলে বাকী অর্ধেক সাম্রাজ্যের মালিক তুমি এমনিই হয়ে যাবে। তুমি হবে তখন রাষ্ট্রপ্রধান।

এ প্রস্তাব শুনে ঘৃণা আর ক্রোধে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে হুযাইফা (রা.) এর সমস্ত দেহ কাঁপতে শুরু করল। আঘাত খাওয়া বাঘের ন্যায় তার সমস্ত সত্তা যেন একত্রে লাফিয়ে উঠলো। অতঃপর তার অগ্নিঝরা কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত হলো- হে রোমের কুকুর! তুমি কি দুনিয়ার বিনিময়ে আমার দ্বীন ক্রয় করতে চাও? দুনিয়ার সম্পদ দিয়ে আমার ধর্ম কিনে নিতে চাও? বেওকুফ কোথাকার! খবরদার! এই নিকৃষ্ট বাজে কথা আমার সামনে আর কখনোই উচ্চারণ করবে না।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে হুযাইফা (রা.) এর বক্তব্যে সম্রাটের মাথায় যেন আগুন ধরে গেল। ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে সে হিংস্র হায়েনার রূপ ধারণ করলো। সে একটু অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে বললো, আমি রোমের সম্রাট! সমস্ত রোমবাসী আমার কথায় উঠা-বসা করে!! আর এক দুর্বল বন্দী কি-না আমাকে চোখ রাঙ্গিয়ে কথা বলে!!! কত বড় স্পর্ধা তার! দাঁড়াও, এখনই মজা বুঝিয়ে দিচ্ছি।

অতঃপর সম্রাট তার অনুগত বাহিনীকে কড়া নির্দেশ দিয়ে বললো, যাও, এদেরকে এখনই জেল খানার প্রকোষ্টে আবদ্ধ কর। আমার আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত তাদেরকে যেন এক দানা খাদ্যও না দেয়া হয়, এক ফোটা পানিও না দেয়া হয়।

সম্রাটের নির্দেশ মোতাবেক তা-ই করা হল। আজ কয়েকদিন যাবত মুসলিম মুজাহিদদের খানা-পিনার সাথে কোন সাক্ষাত নেই। সকলেই নিস্তেজ ও দুর্বল হয়ে পড়েছেন। মনে হয় মৃত্যু যেন তাদেরকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

এদিকে সম্রাট একজন বিজ্ঞ ডাক্তারকে এ বলে জেলখানায় পাঠিয়ে দিলেন যে, তুমি তাদের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখবে। যখন দেখবে যে, এখন খানা না খেলে তারা মারা যাবে ঠিক তখনই আমাকে সংবাদ দিবে। কারণ আমার মূল উদ্দেশ্য হল, ওদের পরীক্ষা করা, মেরে ফেলা নয়।

ক্রমাগত কয়েক দিন খেতে না দেয়ার পর ডাক্তার যখন দেখলেন, মুজাহিদদের শিরা একেবারে নিস্তেজ হয়ে পড়েছে, শরীরের স্পন্দনও মনে হয় থেমে যাচ্ছে, সকলেই অচেতন হয়ে পড়ে আছে, তখন তিনি সম্রাটের নিকট খবর পাঠালেন যে, এ মুহূর্তে যদি তাদেরকে খাবার না দেয়া হয় তবে তাদের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে না।

খবর পেয়ে সম্রাট নির্দেশ দিলেন, ওদেরকে শুকরের গো ও মদ মিশ্রিত পানি খেতে দাও। আর স্পষ্ট বলে দাও যে, এটা শুকরের গোশ্ আর এটা মদ মিশানো পানি। যদি বাঁচতে চাও তবে এগুলোই তোমাদের খেতে হবে। এ ছাড়া তোমাদের জন্য দ্বিতীয় কোন ব্যবস্থা নেই।

সম্রাটের কথামত যখন বন্দী মুসলমানদের সামনে এ সব হারাম ও নাপাক খাবার পরিবেশন করা হল এবং সবকিছু পরিস্কার জানিয়ে দেয়া হল, তখন দলপতি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে হুযাইফা (রা.) এক মুহূর্তও দেরী না করে চোখ রাঙ্গিয়ে হুংকার ছেড়ে বললেন, এক্ষুণিই এগুলো সামনে থেকে সরিয়ে নাও। যদি বিন্দুমাত্রও সময় নষ্ট কর তাহলে লাথি মেরে থালা-বাসন ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলবো।

অবস্থা দৃষ্টে কারারক্ষীরা হতবাক হলো। তারা ভাবলো, একটু পূর্বেও যারা ক্ষুধার যন্ত্রণায় পিষ্ট হয়ে মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল; খাবার পরিবশন করার পর খাবার তো খেলই না বরং কত কঠিন কথা তাদের মুখ থেকে উচ্চারিত হল! এ তো এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার!!

প্রসঙ্গক্রমে এখানে একটি কথা পাঠক ভাই-বোনদের জানিয়ে রাখা প্রয়োজন যে, জান বাঁচানোর জন্য যদিও হারাম খাওয়া জায়েয তথাপি যদি অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, হারাম খাবার ভক্ষণ করলে ইসলামের শান-শওকত ও মর্যাদা ভূলণ্ঠিত হবে, ক্ষুন্ন হবে; তখন যদি হারাম না খেয়ে কেউ মৃত্যুবরণ করে তাহলে সে উঁচু পর্যায়ের শহীদ বলে গণ্য হবে। (ফতওয়ায়ে শামী)

যা হোক, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে হুযাইফা (রা.) এর কথা সম্রাটের কানে পৌঁছলে সে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল এবং তাদেরকে চূড়ান্ত পরীক্ষা করার কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল।

অহংকারী সম্রাট তার অনুচরদের নির্দেশ দিল, বন্দী মুসলমানদের প্রত্যেকের জন্য এতবড় একটি ডেগ তৈরী কর যাতে সম্পূর্ণ মানুষটি তাতে ডুবে যায়। অতঃপর ডেগগুলো তৈল দ্বারা ভর্তি করে ফুটাতে থাক। সম্রাটের আদেশ অনুসারে বিশাল বিশাল ডেগ তৈরী করা হল এবং এগুলো বড় বড় চুলার উপর বসিয়ে তৈল দ্বারা পূর্ণ করে দীর্ঘ সময় ধরে জ্বাল দেয়া হলো। এসময় সম্রাট মন্ত্রীদের নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিলো।

তেল যখন টগবগ করে ফুটতে শুরু করল তখন সম্রাট জল্লাদকে নির্দেশ দিয়ে বললো, মুজাহিদদের দলপতি আব্দুল্লাহ ইবনে হুযাইফা (রা.) ছাড়া অন্য যে কোন একজন মুসলিম বন্দীকে এই ফুটন্ত তেলে নিক্ষেপ কর।